একজন শব্দসৈনিকের যুদ্ধ

কোলকাতায় পৌঁছানোর পর কীভাবে যুদ্ধে যোগ দেয়া যায় তা নিয়ে যখন ভাবছি তখন একদিন হঠাৎ করেই পার্ক সার্কাসের কংগ্রেস এক্সিব্শিন রোডের শামসি রেস্তোঁরার সামনে দেখা হয়ে গেল সাংবাদিক – চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবিরের সাথে। শামসি রেস্তোঁরায় তখন পঞ্চাশ পয়সায় গরুর মাংসের তরকারি এবং পঁচিশ পয়সায় দুটো চাপাতি পাওয়া যেত । পকেটে কিছু পয়সা থাকলে সপ্তাহে কয়েকদিনের ব্যবধানে এই অতি সুস্বাদু খাদ্যের দ্বারস্থ হতাম আমি। সেদিন খাওয়ার পরে রেস্তোঁরা কাউন্টার থেকে বিনি পয়সার একমুঠ ধনে মুখে পুরে চিবুতে চিবুতে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে ভাবছি এখন কী করা যায়। এমন সময় আমার কাঁধের ওপরে এসে পড়ল বিশাল এক থাবা। ‘‘কী ব্যাপার, কী করছো এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে?” আমি মাথা ঘুরিয়ে দেখতে পাই আলমগীর কবিরকে। বলি, ‘কিছু না কবির ভাই।” তিনি বললেন, ‘‘কিছু না? দেশে একটা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলছে আর তুমি বলছো কিছু না?” বললাম,‘‘তাই তো ভাবছি কাল একবার কল্যাণীতে রিক্রুটমেন্ট অফিসে যাব। দেখি যদি কিছু একটা হিল্লে হয়।” ‘‘তুমি আমার সাথে এসো। তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।” বলেই পাশের মিষ্টি-কাম-চায়ের দোকানটাতে ঢুকে পড়েন আলমগীর কবির।

”আমি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রর ইংরেজি সার্ভিসটা দেখি। আমার একার পক্ষে সবকিছু সামাল দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। আমার সাহায্য চাই। ইংরেজি ভাষার ওপরতো তোমার দখল ভালই। তুমি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দাও না কেন? আমরা দুজনে একসাথে হলে, We can take them on আর বহির্বিশ্বে আমাদের সংগ্রাম সম্বন্ধে সঠিক সংবাদ আরও বেশি করে দেয়া সম্ভব হবে, বাংলায় তো সেটা সম্ভব নয়।” ”কিন্তু আমি যে যুদ্ধে যাব?”, বললাম আমি। ”আহা, সবাইকে কি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে হবে? এও তো যুদ্ধ এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় যুদ্ধ। শব্দ সৈনিক!” আমি দুদিনের সময় চেয়ে নিই। কবির ভাই দুদিন পর দেখা করতে বলে বালীগঞ্জের একটা ঠিকানা আমার হাতে গুঁজে দেন।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠানগুলো ধারণ করা হতো বালীগঞ্জ সার্কুলার রোড-এর একটি দোতলা বাড়িতে। প্রথম দিন রিপোর্ট করার সাথে সাথেই কবির ভাই আমাকে আমার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন। খবর পাঠ করবেন তিনি স্বয়ং। আমার দায়িত্ব হবে সংবাদ ভাষ্য তৈরি করে পাঠ করা। যুদ্ধ প্রতিবেদক হিসেবে বিভিন্ন সেক্টরের যুদ্ধের প্রতিবেদন তৈরি করে তা রেকর্ড করা এবং সপ্তাহে দুদিন রেডিও পাকিস্তানের ‘হোল ট্রুথ’ এর জবাবে ‘দ্য নেকেড ট্রুথ’ বা ‘নগ্ন সত্য’ রচনা করে তা প্রচার করা। এই কাজগুলোর জন্য বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ওপর আমাকে নির্ভর করতে হতো। ‘নগ্ন সত্য’ অনুষ্ঠানের জন্য রেডিও পাকিস্তানের তাবৎ মিথ্যা প্রচারই ছিল বড় উৎস। যুদ্ধ প্রতিবেদন সরাসরি আসতো সেক্টরগুলো থেকে। কিছু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার-এর তথ্য মন্ত্রনালয়ের সহায়তায় প্রাপ্ত। আবার কিছু হৃদয়গ্রাহী অনুষ্ঠান তৈরি হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে সেক্টর কী সাব-সেক্টর কমান্ডারদের সঙ্গে ধারণকৃত সাক্ষাতকার থেকে। সংবাদ ভাষ্য তৈরি হতো বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সরবরাহকৃত বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং সাময়িকীর ওপরে নির্ভর করে। যুদ্ধ-প্রতিবেদন সংগ্রহে আমাকে অনেকবার বিভিন্ন সেক্টরে যেতে হয়েছে। একবার আট নম্বর সেক্টর প্রধান মেজর মঞ্জুরকে ইন্টারভিউ করেছিলাম। সে স্মৃতি আজও অম্লান আমার হৃদয়ে।
যখন বুঝতে পারলাম যে, শেষ পর্যন্ত আমি সত্যিকার অর্থেই একজন শব্দ সৈনিক হয়ে উঠেছি, আমার পক্ষে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে যাওয়া আর সম্ভব নয়, তখন সম্পূর্ণ আত্মনিয়োগ করলাম নিজের কাজে। প্রতিদিন আমার মতো এই অধমের কলম দিয়েও বেরিয়ে আসতে লাগলো অগ্নিঝরা, ক্ষুরধার রাজনৈতিক ভাষ্য। ছুটে বেড়াতে লাগলাম, বাংলাদেশের পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত প্রতিটি সেক্টরে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার আগে ঢাকা থেকে একটি ইংরেজি দৈনিক বের হতো। যার নাম ছিল দ্য পিপল। এই দৈনিকটির সম্পাদক আবেদুর রহমানের সাথে আমার পরিচয় ছিল। ২৫শে মার্চ রাতে শাহবাগ অঞ্চলে অবস্থিত দ্য পিপল-এর অফিসে গোলা বর্ষণ করে আগুন ধরিয়ে দেয় পাক আর্মি। । দৈনিক দ্য পিপল-এর সম্পাদক আবেদুর রহমান সীমান্ত পেরিয়ে কলকাতায় এসে ঠাঁই নেন। কলকাতার আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রোডের একটি প্রেস থেকে সাপ্তাহিক পিপল নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। আবেদুর রহমানের আহবানে আমি সাপ্তাহিক পিপল-এও উপসম্পাদকীয় লিখতে আরম্ভ করি। এছাড়াও বিদেশি অভ্যাগতরা যখন কলকাতা সফরে আসতেন, বাংলাদেশের যুদ্ধ সম্বন্ধে খবরাখবর নিতে, তাদের সাক্ষাতকার গ্রহণ করে আমি ছাপিয়েছি এই পত্রিকায়। এই সময় আমার দুটি বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট সম্বন্ধে কিছু না বললেই নয়। তার প্রথমটি হলো, মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডীকে নিয়ে কলকাতার অদূরে সল্টলেকের শরণার্থী শিবিরে যাওয়া এবং দ্বিতীয়টি হলো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য তৎকালীন বৃটিশ পার্লামেন্টের লেবার পার্টির সাংসদ জন স্টোনহাউসের সাক্ষাৎকার গ্রহণ। এইসব কাজে, বলাই বাহুল্য, প্রচন্ড আনন্দ পেয়েছি আমি। এছাড়াও তখন প্রায় প্রতি মাসে আমাদের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের একটি ভাষণ জাতির উদ্দেশ্যে সম্প্রচার করা হতো আমাদের বেতার থেকে। আমার দায়িত্ব ছিল ঐ ভাষণটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে তাঁর হয়ে বেতারে পাঠ করা। আমি এই একই কাজ আমাদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজুদ্দিন আহমেদের জন্যও করেছি। অসাধারণ বক্তৃতা লিখতেন দুজনই। এবং তাদের প্রতিটি বাক্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরের প্রায় বন্দী দশায় থাকা সকল মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। এই সময় আমার সুযোগ হয়েছিল মাঝে মধ্যে আমাদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার। তাঁর পরিশ্রম করার ক্ষমতা, সততা এবং মেধা আমায় চমৎকৃত করতো। কোন বিষয় কখনো তাঁর চোখ এড়িয়ে যেতে দেখিনি।

বস্তুতপক্ষে, একটি বিষয় যা আমাদের সামগ্রিক সাফল্যে সবচেয়ে বেশি সহায়তা দিয়েছিল তা হচ্ছে আমাদের তখনকার প্রধানমন্ত্রী তাজুদ্দিন আহমেদের পরামর্শ। তাঁর যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের সময় নির্দেশ ছিল যে, যাকে যে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে, সে সেই কাজটিই যথাসাধ্য আন্তরিকতার সাথে সম্পাদন করবেন। এই জন্য আমি হেন নগন্য ব্যক্তি যে একটি বিদেশি ভাষায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে একটি বিভাগ পরিচালনা করেছি, সে নিজ কাজে এবং উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ নিবেদিত ছিলাম।

সেই অরুণোদয় থেকে

পৃষ্ঠা ১৯৪ -২০৬ মধ্য থেকে লেখা