সেই সব রঙিন দিনগুলি

আমার জীবনের একেবারে আদি স্মৃতির সাথে একটি চিতা বাঘ জড়িয়ে রয়েছে। নাদু ভাইয়ের কোলে আমি। সামনে খাঁচায় বন্দী একটা চিতা বাঘ। খাঁচাটা বেশ ছোট। তার ভেতরেই বাঘটা ঘোরাফেরা করছে। রাগে ফুঁসছে। নাদু ভাই আমাকে একেবারে বাঘটার মুখের কাছে নিয়ে গেল। বাঘটি মহা বিরক্ত হয়ে বিশাল একটা হালুম দিল। আমি ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেললাম। এইটিই সেই প্রথম স্মৃতি। আমার বাবা তখন মেহেরপুরের মহকুমা হাকিম আর নাদু ভাই তাঁর আর্দালি। ইংরেজি অর্ডারলি’র বঙ্গজিকরণ হলো আর্দালি। আজকাল পিওন বলে যাদের সম্বোধন করা হয়। আমার বাল্যকালে এঁদের সবাইকে ভাই বলে ডাকতাম। অসাধারণ সব লোক ছিলেন এঁরা। আমার বাবা-মা’র চেয়ে কম দেখভাল করতেন না আমাদের। প্রায় নিজের সন্তানের মতো এঁরা দেখতেন আমাদের। এরপরের স্মৃতি মাদারীপুরের। ১৪ অগাস্ট, ১৯৪৭। সেই দিনই আমরা পাকিস্তান হয়ে গেলাম। স্পষ্ট মনে আছে বাবা স্যুট পরা, একটা স্টেজের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। পুলিশ ব্যান্ডের সাথে সাথে মার্চ করে খাকি পোশাক পরা তাবৎ পুলিশ সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। বাবা সালাম নিচ্ছেন।

Mohammad Taher, father of Aly Zaker

আমার শৈশবে যে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাটির অভিঘাত আমাকে সেই বয়সে আন্দোলিত করেছিল তা হলো আমার দিদির বিয়ে। দিদির বিয়ের সময়, কুষ্টিয়া শহরে, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব পরিবেষ্টিত হয়ে থাকতে খুবই ভাল লেগেছিল আমার। এখন বসে ভাবলে বুঝি যে মানুষের জীবনে স্বীকৃতির মূল্য কতখানি। আমার আপন বড় বোনের বিয়ে হচ্ছে। অতএব, আমার দাম বেড়ে গেল ম্যালা গুণ। সকলের কাছে আমার দাম, দিদির থেকে কোনো অংশে কম নয়। সব ব্যাপারেই ছোটলুর ডাক পড়ে। ছোটলু আমার ডাক নাম। কলকাতা, ঢাকা, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম এমনকি আমাদের গ্রাম ব্রাহ্মনবাড়িয়ার রতনপুর থেকেও অনেকে এসেছিল বিয়েতে। এই বিয়েকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ার মতো ছোট শহরটিতে ধুম ধাড়াক্কা লেগে গিয়েছিল। আম্মার খুব শখ ছিল যে দিদির বিয়েতে খুব ভালো ব্যান্ডপার্টি আসবে। নানা কলকাতা থেকে একটা ব্যান্ডপার্টি নিয়ে এসেছিলেন। কলকাতার সেই ব্যান্ডপার্টি ধোপদুরস্ত পোশাক পরে নিরন্তর আধুনিক বাংলা গান এবং হিন্দি সিনেমার গান বাজিয়ে উপস্থিত সকল অতিথিকে আমোদ জুগিয়েছিল প্রায় তিন-চারদিন। আমরা বিয়ের দিনের অপেক্ষায়, উত্তেজনায় এমন আকন্ঠ নিমজ্জিত ছিলাম যে বিয়ের দিনটা পেরিয়ে গেলে কেমন লাগবে এ কথা মনেই আসেনি। শেষ পর্যন্ত দিদির বিয়ে হয়ে গেল। বেশ ধুমধাম করেই হলো। দিদি ফুল সাজানো গাড়িতে উঠে আমাদের বাড়ি ছেড়ে তার নতুন ঠিকানায় চলে গেলেন। পেছনে পড়ে রইল তার চির চেনা পৃথিবী। ভাই-বোন, মা, বাবা সবাইকে কান্নায় ভাসিয়ে আমার দিদি আমাদের ছেড়ে চললেন তাঁর নতুন জগতে। দিদির চোখে সেদিন নেমে এসেছিল অশ্রুর বন্যা।

দিদি চলে গেছে বরের বাড়ি। আমার ভেতর থেকে কান্না উথলে ওঠে। যে ঘরে দিদি থাকতো সেখানে আসবাবপত্রের মধ্যে, দিদির আলমারির ভেতরে যেন তাঁর ঘ্রাণ পাই। বিড়ালের বাচ্চার মতো যত্রতত্র, বাড়ির এ কোণে- সে কোণে দিদির ঘ্রাণ খুঁজে ফিরি আমি। দিদিবিহীন আমার জীবন বড় নিষ্প্রভ হয়ে পড়ল। কোনো কিছুই ভালো লাগে না। অথচ দিদির বরের বাড়ি আমাদের বাসার কাছেই। কিন্তু সেখানে গেলে কেমন যেন লাগে। কেন যেন মনে হয়, সেখানে দিদি আছে, কিন্তু দিদি নেই। আমার ছোট বোন ঝুনুরও অনেকটা একই অবস্থা। আমরা কাশবনের মধ্যে, গড়াই নদীর ধারে, আমের বাগানে, আমাদের প্রিয় সব জায়গাতে ঘুরে বেড়াই কিন্তু ভালো লাগে না। দিদি যখন আমাদের বাসায় বেড়াতে আসে তখন তাকে ঘিরে অনেক হৈচৈ হয়। পুরনো দিনের গল্প, আড্ডা হয়, হাসি-ঠাট্টা হয়। আমরা আবার আমাদের অতীতে ফিরে যাই কয়েক ঘন্টার জন্য। কিন্তু দিন গড়িয়ে রাত হলেই দিদিকে ফিরতে হয় তার বরের বাড়ি। আমরা আবার নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ি।

Razia Taher, mother of Aly Zaker

ইতিমধ্যে পেরিয়ে যায় বেশ কিছু সময়। দুলাভাই বদলি হয়ে গেছেন ঢাকায় মণিপুর ফার্মে। সেখানেই আমাদের দিদি অন্তঃসত্ত্বা হন। প্রথাসিদ্ধভাবে প্রথম সন্তান হবে মায়ের বাড়িতে সেই জন্য আমরা সবাই চট্টগ্রামে চলে গেলাম। চট্টগ্রামে আমার বাবা নিজস্ব বাড়ি তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। তাই চট্টগ্রামই ছিল আমাদের নিজের শহর। অতএব, দিদিকে সেখানেই আনা হলো। অল্প কদিনের মধ্যেই দিদির প্রথম সন্তান টুটু’র জন্ম হয়। আমরা আনন্দে আটখানা। আমাদের পরিবারে প্রথমবারের মতো পরবর্তী প্রজন্ম যাত্রা শুরু করল। এই বিষয়টির তাৎপর্য বোঝার মতো বয়স তখনও হয়নি আমার। তবে অকস্মাৎ এবং একেবারে জলজ্যান্ত একটা ক্ষুদেকায় মানুষ আমাদের পরিবারের সদস্য হিসেবে এসেছে এই আনন্দে আমরা আত্মহারা হয়ে গেলাম।
চট্টগ্রামে আমার শৈশবের এবং কৈশোরের অনেক দিন কেটেছে। এনায়েতবাজারের রোডে ছিল বাবার বাড়ি। সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে ডানে গেলেই ডিসি হিল। সেটি ছিল আমার প্রিয় একটি জায়গা। পথে পড়তো সঙ্গীত পরিষদের লাল দোতলা বাড়ি। নানা ধরনের গানের সুর ভেসে আসতো শিক্ষার্থীদের কন্ঠ থেকে। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। এই সময় কিছু কিছু বাংলা গান আমার প্রাণে অনুরণন তুলতো। এগুলো সবই দিদির শখের গ্রামোফোনের মাধ্যমে। পংকজ মল্লিকের গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত দিদির খুব পছন্দের ছিল। আর ছিল হেমন্তের গাওয়া আধুনিক বাংলা গান। এছাড়াও দিদির পছন্দের ছিল কুন্দনলাল সাইগলের গান। দিদি পরে বুলবুল একাডেমিতে সেতার শিখেছিলেন ওস্তাদ খাদেম হোসেন খানের কাছে। আমার মা’র একটা অর্গান ছিল। তাতে প্যাডেল চেপে চেপে দ’ুহাতের আঙুলের ছোঁয়ায় মা অবলীলায় নজরুলগীতি গাইতেন। তবে আমি আর ঝুনু একটু বড় হবার পর মা’র গান গাওয়াটা ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ঢাকায় আমাদের গেন্ডারিয়ার বাসায়, বসার ঘরে অর্গানটা দাঁড়িয়ে থাকত একা, নিঃসঙ্গ। একবার কি দুবার আমাদের স্বজনদের কারো বিয়ের পরে সংবর্ধনায় মাকে গাইতে শুনেছি। মাঝে মাঝে বড় আক্ষেপ হতো যখন দিদি বলতো মা কেমন করে আসরের মধ্যমণি হয়ে গান গাইতেন দিদির শৈশব-কৈশোরের সময়।

টুটুর জন্মের পর চল্লিশ দিন পার হয়ে গেলে দিদি চলে গেল কুমিল্লায়। দুলাভাই ততদিনে ঢাকা থেকে বদলি হয়ে কুমিল্লায় চলে এসেছেন। আমরা ফিরে গেলাম কুষ্টিয়ায়। চার মাস পর টুটু মারা যায়। টুটু মারা যাওয়ার কিছুদিন পর দিদি ফিরে এলো কুষ্টিয়ায়। সে সময় মা আর দিদি পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে

অনেক কাঁদলেন। আমারও যেন মনটা কেমন করতে লাগল। দৌড়ে চলে গেলাম গড়াই নদীর সান্নিধ্যে। এই একটা ব্যাপার ছিল। সুখে কিংবা দুঃখে কুষ্টিয়ার ঐ দিনগুলোতে গড়াই নদীই ছিল আমার একমাত্র সান্ত¦নার জায়গা। দিদি ফিরে গেল কুিমল্লায়। সঙ্গে গেল ঝুনু। এর কিছুদিন পর আমরা, মানে আমি, মা আর ভাইয়া কুমিল্লায় গেলাম দিদির বাড়িতে বেড়াতে। কুমিল্লা স্টেশনের খুব কাছেই ছিল দিদির বাড়ি, শাসনগাছায়। কৃষি ফার্মের বিশাল এলাকার মধ্যে একটা বড় দিঘির একধারে ছিল দুলাভাইয়ের বাংলো। দিঘির সামনে ছোট্ট একটা ঘাট যেখানে বসে আমি আর আমার ছোট বোন তার বেঁকিয়ে বড়শি বানিয়ে এন্তার পুঁটি মাছ ধরতাম। আমরা কুমিল্লা পৌঁছুনোর সাথে সাথে ঝুনু, আমার ছোট বোন, আমাকে তার বেড়ানোর গল্প শুনিয়ে ফেলল। দাউদকান্দি, জাফরগঞ্জ, জগন্নাথ দিঘি, লালমাই কিংবা ময়নামতি কোথায় যায়নি সে দিদি আর দুলাভাইয়ের সাথে পিকনিক করতে? এখন বুঝতে পারি টুটু মারা যাওয়ায় দিদি যে বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিলেন, সেই বিষণ্ণতা কাটানোর চেষ্টায় দুলাভাই প্রতিটি ছুটির দিনেই একটি বেড়ানোর আয়োজন করতেন।

কুমিল্লায় থাকতে থাকতেই হঠাৎ বন্যা এলো। ক’দিন ধরে বেশ অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছিল। দিদির বাড়ির টিনের চালে সেই বৃষ্টির গান শুনতে শুনতে আমরা ঘুমিয়ে পড়তাম। একদিন হঠাৎ নানা মানুষের চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে যায়। দেখি মেঝের উপরে পানি এসে গেছে। তখন কুমিল্লার পাশ দিয়ে বয়ে চলা গোমতী ছিল এক উন্মত্ত নদী। বিশেষ করে বর্ষায়। পাড়ের বাঁধ ভেঙে পানি হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছিল কুমিল্লা শহরে। দিদির বাড়ির ভিটে ছিল অপেক্ষাকৃত নিচু। ফলে সেখানে থাকাটা নিরাপদ ছিলনা। আমরা চলে গেলাম মৌলভিবাড়ি, আমাদের নানা বাড়িতে। সেখানে ঘরের ভেতর পানি ছিলনা বটে কিন্তু উঠোনে ছিল পানি যেখানে পুকুর থেকে ভেসে আসা মাছ লাফালাফি করছিল। দিদি এবং মা বলছিলেন সময়টা বিপদের। সুতরাং সেই মাছ ধরার চিন্তাও মনে আসেনি কখনও। আস্তে আস্তে একসময় বন্যার পানি শুকিয়ে এলো। কুমিল্লায় তখন দিব্যি রিকশা দিয়ে ঘোরাঘুরি করার যায়। আমরা দিদির বাড়ি ফিরে এলাম। দিদি বলল, ”ব্যাপারটা সেলিব্রেট করা দরকার। চলো যাওয়ার পথে মাতৃভান্ডার থেকে মিষ্টি খেয়ে যাবে। সেই সঙ্গে বাসার জন্যে কিছু মিষ্টি নিয়ে নেওয়া যাবে।” আমরা খুশিতে ডগমগ। সবাই দিদির সঙ্গে মাতৃভান্ডারে চললাম। দিদির কল্যাণে আমরা বাল্যকাল থেকে যৌবন পর্যন্ত কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা কিংবা ঢাকায় নানাবিধ মুখরোচক খাবার অহরহ খেয়েছি। মাতৃভান্ডার সেই সময় কুমিল্লার বিখ্যাত মিষ্টির দোকান ছিল। এখনো অবশ্য তাই। তবে সেই সময়ের মাতৃভান্ডারের মিষ্টির স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে।

কুমিল্লায় ক্রমে আমাদের দিন ফুরিয়ে এলো। ইতিমধ্যে আমরা খবর পেলাম যে বাবা ঢাকায় বদলি হয়ে গেছেন। বাবার বদলির খবর আমাদের কাছে পৌঁছামাত্র মা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তাকে কুষ্টিয়ায় ফিরে যেতে হবে অবিলম্বে কেননা কুষ্টিয়ার সংসার গোটাতে হবে যত শীঘ্র সম্ভব। একেবারে কুটিকাল থেকে দেখে তো আসছি মেহেরপুর, মাদারীপুর, ফেনী, খুলনা, কুষ্টিয়া। প্রতিবারই বিদায়ের সুর আমাদের অন্তরকে ভিজিয়ে দিয়েছে। প্রতিবারই নতুনের আবাহন আমাদেরকে উচ্ছল করেছে।

উৎসঃ সেই অরুণোদয় থেকে